fbpx

অনলাইন প্রফেশনালদের নিয়ে কিছু কথা

১০ বছর আগে মোবাইলের কথা চিন্তা করুন, যেখানে বিশাল সাইজের মোবাইলের স্ক্রীন ছিল অনেক ছোট। যেখানে কীপ্যাড এ টাইপ করা নাম্বার এবং টেক্সট ম্যাসেজ ছাড়া আর কিছু দেখা যেত না। আর এখনকার স্মার্ট ফোন এর কথা ভাবুন? যেখানে কোন বাটনই খুজে পাবেন না। কিন্তু এই বাটন ছাড়া  মোবাইলটিতেই করতে পারবেন আপনার দরকারি প্রায় সব কাজ।

এবার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আবারো দশ বছর পিছনে যেতে পারেন, যেখানে হরতাল সহ অন্যান্য যেকোন রাজনৈতিক সমস্যা অথবা প্রাকৃতিক দু্র্যোগের দিনেও অফিসের একটি ক্ষুদ্র কাজ করার জন্য আপনাকে অফিস ভবনেই উপস্থিত থাকতে হত, কিন্তু বর্তমানে যে কোন সমস্যাতে আমি সহ আমার অফিসের সবাই ঘরে বসেই অফিসের সব কাজ শেষ করতে পারে। আমি শুধু আমার অফিসের কথা বললাম, আমার মত যারা অনলাইন প্রফেশন এর সাথে সম্পৃক্ত তাদের সবারই একই ধরনের সুবিধা রয়েছে। আমার আজকের লেখায় মুলত তাদের জন্য, যারা এই প্রফেশন এর সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে অবগত নয়, অথবা যারা এই ধরনের প্রফেশন সম্পর্কেই অজ্ঞ।

অন্যান্যরা অফিসে/ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে কি করেন আর আমরা ঘরে বসে কি করি?

ধরে নেই আপনি একজন ক্ষুদ্র অথবা মাঝারি ব্যাবসায়ি। কোন এক মার্কেটে আপনার একটি জুতার শোরুম রয়েছে। শোরুমটি চালু করানোর জন্য আপনার কিছু সেলসমেন রয়েছে। ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য আপনি আপনার দোকানকে সাজিয়েছেন অনেক লাইট এবং দামি আসবাব দিয়ে। সিলিংটিও সাজিয়েছেন সাধ্যমত। সম্ভাব্য ক্রেতা দেখলেই হয়ত আপনার সেলসম্যান তাকে ডেকে আকৃষ্ট করতে চাইছে। ক্রেতা ঢুকলে তারপর চেষ্টা চালানো হবে জুতা বিক্রি করার।

এবার ধরে নিন, আমিও জুতা বিক্রি করি, তবে আমার দোকান নেই। আমার আছে একটা ওয়েবসাইট। আমিও আমার ওয়েবসাইটকে আমার সাধ্যমত সাজিয়েছি। আমারো কিছু সেলসম্যান রয়েছে, যারা ইন্টারনেট ব্যাবহারে দক্ষ। আপনার আর আমার পন্য একই। ক্রেতাও একই। ব্যাবসাও একই। শুধু ধরনটা ভিন্ন। আপনি মানুষকে আপনার দোকানে আসতে উৎসাহিত করতে চান, আর আমি আমার ওয়েব সাইটে।

আপনার ব্যাবসাতেও পর্যাপ্ত ইনভেস্ট করতে হয়েছে, আমারটাতেও তাই। আপনার যেমন আপনার দোকানে থাকা জরুরি, তেমনি আমারো অনলাইনে থাকা জরুরি। কিন্তু আমি একটু এগিয়ে, আপনি চাইলেও ঘরে আর দোকানে একসাথে থাকতে পারবেন না, কিন্তু আমি ঘরে আর দোকানে একসাথে থাকতে পারবো। শুধু ঘর নয়, রেস্টুরেন্ট, আত্মীয় স্বজনের বাসা আর দোকানেও একসাথে থাকতে পারবো। এমনকি যেখানেই থাকি না কেনো, ইন্টারনেট কানেকশন থাকলেই আমরা আমাদের ব্যাবসা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।

আমরা যারা সার্ভিস দিয়ে থাকি তারা আসলে কি করি?

এবার ধরে নিন, আমি পন্য বিক্রি করি না, আমি সার্ভিস প্রোভাইড করি। যেমনটা করে থাকেন ব্যাঙ্ক এ কর্মরত অনেক কর্মী, অথবা ছোট বড় সরকারি, বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত ভাই বোনেরা। এখানেও পার্থক্যটা ঠিক আগের মতই। যেহেতু আমাদের পন্য, ব্যাবসা, সার্ভিস সহ মোটামুটি সব কিছুই অনলাইন কেন্দ্রিক তাই আমাদের জন্য অফিসে যাওয়ার চাইতে অনলাইনে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ

এখন আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা কোন নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সার্ভিস প্রোভাইড করছেন না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ করছেনঅনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য। কাজ শেষ তার মানে নতুন কাজ খুজতে হবে। অর্থাৎ এই ধরনের কাজ কে চাকরির সাথে তুলনা করার কোন সুযোগ নেই। অনেকে এই যায়গাটিতে ভয় পেয়ে থাকেন, ভাবেন এর কোন নিশ্চয়তা নেই। আজ কাজ আছে তো কাল নেই। আমিও তাদের সাথে একমত। তবে প্রশ্ন হচ্ছে যারা এই ধরনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ করছেন তারা আসলে কি করছেন? এর উত্তর হচ্ছে তারা ব্যাবসা করছেন। আপনি যখন অফলাইনে ব্যাবসা করছেন তখন কি আপনি নিশ্চয়তা দিতে পারবেন যে আপনার সবসময় ক্লায়েন্ট অথবা ক্রেতা থাকবে, আপনার ব্যাবসায় কখনো ক্ষতি হবেনা? আমার মনে হয় পৃথিবীর কোন ব্যবসায়ি এইধরণের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না, আমরাও পারি না।

আরেকটু পরিস্কার করার চেষ্টা করি, অফলাইনের মতই আমাদের ব্যাবসাটা পন্য কেন্দ্রিক হতে পারে, আবার সার্ভিস প্রোভাইডিংও হতে পারে। একটা উদাহরন দেই, একটা অফিস ডেকোরেট করতে হলে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের দরকার হয়। ঠিক তেমনি একটা ওয়েবসাইট ডিজাইন করতে গেলে একজন ওয়েব ডিজাইনারের দরকার হয়। বেপারটা অনেকটা একই রকম। একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার একটা অফিস ডিজাইন করার পর তার কাজ শেষ হয়ে যায়, তার নতুন ক্লায়েন্ট খুজতে হয়, একই ভাবে একজন ওয়েব ডিজাইনারেরও একটা ওয়েব সাইট ডিজাইন করা শেষ হয়ে গেলে তারো নতুন ক্লায়েন্ট খুজতে হয়।

কি করছি তা গুরুত্বপূর্ণ, কোথায় বসে করছি তা নয়

ব্রাক ব্যাংক এ কর্মরত দুইজন কর্মী, একজন মতিঝিল ব্রাঞ্চ এ জুনিয়র অফিসার, আরেকজন রুপগঞ্জ ব্রাঞ্চ এর মেনেজার। এখন এদের মধ্যে আপনি কাকে এগিয়ে রাখবেন। একজন মতিঝিলের মত যায়গাতে বসে কাজ করে, এই মতিঝিল যা রাজধানির এমনকি দেশের প্রান কেন্দ্র বললেও ভুল হবে না। আরেকজন করছে রুপগঞ্জে। আপনি এদের মুল্যায়ন কিভাবে করবেন? তাদের পদবি, নাকি তারা কোথায় বসে কাজ করছেন তার উপর?

কে কোথায় বসে কাজ করছেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তিনি কি করছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে যে ব্যাক্তিটি ঘরে বসে কাজ করছে্ন তিনি হয়ত আমেরিকার কোন এক বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ করছেন। আবার যিনি রুপগঞ্জে অফিস করছেন, তার প্রমোশন হয়েছে, আর তাই তাকে এই ব্রাঞ্চ এ পাঠানো হয়েছে। তাই আবারো লিখছি, কে কোথায় বসে কাজ করছে তা মূল বিষয় নয়, কে কি করছে তাই হচ্ছে মূল বিষয়।

Online Professional

ঘরে বসে কাজ করা মানে এই নয় যে চাইলেই যে কেউ করতে পারবেন

আমি আগেই বেশ কয়েকটি উদাহরন এর সাথে উল্লেখ করেছি যে এই অনলাইন জগতের কাজের ক্ষেত্রটাও অফলাইনের মতই। তাই এখানেও সফলতার রাস্তা হচ্ছে প্রতিভা এবং পরিশ্রম। বরং এই ক্ষেত্রটা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। প্রথমত এটা একটি আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র, তাই এখানে সফলতার সম্ভাবনাটাও যেমন বড়, তেমনি প্রতিযোগীতাও অনেক বেশী। দ্বিতীয়ত এই ক্ষেত্রটি অনেক দ্রুত পরিবর্তিত হয়, তাই সবসময় নিজেকে অনেক বেশি আপটুডেট রাখতে হয়।

আমি আমার পরিচিত অনেককে অনেক ভাল রেজাল্ট করতে দেখেছি মুখস্ত বিদ্যার জোরে, কিন্তু এটা এমন একটা ক্ষেত্র যেখানে আপনাকে টিকে থাকতে হলে সার্টিফিকেট দিয়ে নয়, আপনাকে কাজ দিয়ে টিকে থাকতে হবে। তাই এটা ভাবার বিন্দু মাত্র অবকাশ নেই যে এই ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য মেধার প্রয়োজন নেই। তবে কাউকে কাউকে হয়ত আপনি এমন কিছু কাজও করতে দেখবেন যেটার জন্য আসলেই তেমন মেধার প্রয়োজন নেই, আর এ ধরনের কাজ যে শুধু অনলাইনেই পাবেন তা নয়, ব্যাঙ্ক সহ অন্যান্য সব কর্মক্ষেত্রেই এরকম কিছু পদ থাকে, কিছু কাজ থাকে।

“ঘরে বসে কাজ করা”- একে এত বেশি ফোকাস করার প্রয়োজন নেই

যদিও আমি এতক্ষন লিখার মধ্য অনেকবার ঘরে বসে কাজ করার সুবিধা উল্লেখ করেছি, কিন্তু এর মানে এই নয় যে অনলাইন প্রফেশনাল হলে আপনাকে ঘরে বসেই কাজ করতে হবে। ঘরে বসে কাজ করার যেমন অনেক সুবিধা রয়েছে তেমনি অনেক অসুবিধাও রয়েছে। আপনি কর্পোরেট অথবা অফিসিয়াল জীবনটাকে মিস করবেন। আপনার মধ্যে একঘেয়ামি চলে আসবে। একটা সময় পর আপনার প্রোডাক্টিভিটি কমে যাবে।

আমেরিকা সহ বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশে সবাই অনলাইনে কেনাকাটা করে, তাই বলে কি সেখানে মার্কেটের সংখ্যা কমে গেছে? অফলাইনে তাদের বেচাকেনা হয় না? ওখানে সবাই অনলাইনে যেমন কেনাকাটা করে তেমনি মার্কেটে গিয়েও করে। অনলাইনে যেমন খাবার অর্ডার করে বাসায় এনে খায় তেমনি বন্ধু বান্ধব এবং পরিবারের সবাই মিলে বাসা থেকে রেস্টুরেন্টেও খেতে যায়।

একই ভাবে ফ্রীল্যান্সিং অথবা অনলাইনে ব্যাবসা করা মানেই ঘরে বসে কাজ করা নয়, ঘরে অথবা ঘরের বাইরে আপনার অফিস অথবা ওয়ার্ক ষ্টেশন থাকা জরুরি। যদি কখনো আপনার অফিসে যাওয়া সম্ভব না হয়, অথবা অফিসে কাজ শেষ করতে পারেননি তখন একটা সুবিধা আপনার রয়েছে, আর তা হচ্ছে ঘরে বসে বাকি কাজটুকু সম্পন্ন করা। তাই ঘরে বসে এই কাজ করা যায়, এটা একটা অতিরিক্ত সুবিধা, তবে এটা অবশ্যই মূল সুবিধা নয়। আর আমরা যারা অনলাইন সেক্টর এ কাজ করি তারা যখন মনোযোগ দিয়ে কাজ করি, তখন কে কোথায় বসে আছে তা তার নিজের মাথায়ই থাকে না। চোখ থাকে মনিটরে, হাত থাকে মাউস এবং কিবোর্ডে, আর মস্তিস্ক থাকে তার কাজের মধ্যে। আপনি যদি এমন অবস্থায় কাউকে জিজ্ঞাসা করেন সে কোথায় আছে, আমি নিশ্চিত তার মস্তিস্ক ৫ সেকেন্ড সময় নিবে আপনাকে উত্তর দিতে, কারন মস্তিস্ক নিজেই ভুলে যায় সে কোথায় আছে 😛 ।

সব শেষে, অন্যান্য সব সেক্টরের মত এখানেও টিকে থাকতে হলে, সফল হতে হলে কঠোর পরিশ্রম, পড়াশুনা এবং ক্রিয়েটিভিটি দিয়েই টিকে থাকতে হবে। এখানে ছাত্র জীবনের চাইতেও বেশি পড়তে হয়, শুধু এখানে খাতা কলমে পরীক্ষা দিতে হয় না, আর নম্বর দিয়ে তাকে মুল্যায়ন করা হয় না, এখানে পরীক্ষাদিতে হয় সরাসরি তার কর্মক্ষেত্রে আর তার মুল্যায়ন করা হয় তার ক্যারিয়েরে/ব্যাবসাতে কিরকম সফলতা নিয়ে আসলো তার উপর।

আশা করি আমার যে সকল ভাই ব্রাদারগন এই সেক্টর এ কাজ করার জন্য বিয়ে জনিত সমস্যাতে ভুগছেন, এই ব্লগ পোষ্টটা তাদের কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারবে 😛 আপনার হবু শশুর শাশুরি পর্যন্ত এই লিখা পৌছে দেয়ার দায়িত্ব আপনার নিজের।