fbpx

কলকাতা ডায়েরি – পর্ব ২

এক ইন্ডাস্ট্রি কলিগের কাছ থেকে একটি ট্রিট পাওনা ছিল, আমি যে সময় কলকাতাতে উনিও সে সময় কলকাতা, তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে ট্রিটটি উনি কলকাতাতেই দিবেন। ফেসবুকের এই যুগে কমিউনিকেশন যেহেতু অনেক সহজ হয়েছে, তাই ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের কল্যানে আমাদের ট্রিট পর্বের স্থান সিলেকশন হয়ে গিয়েছে।

আমি সন্ধার দিকে হোটেল থেকে বের হলাম, গন্তব্য আমার হোটেলের ঠিক উল্টা পাশের মেট্র শপিং মল। বাইরে লাইটিং করা, অনেকটা বিয়ে বাড়ির লাইটিং এর মত। মার্কেটের মুল ভবনের গেইটের বাইরে কিছু খাবার দোকান। ভিতরে নিচ তলাতেও কিছু খাবারের দোকান চোখে পড়লো। সম্ভবত মার্কেটটি ৪/৫ তলা, ছোট একটি মার্কেট। পুরাটাই অনেক অল্প সময়ে চক্কর দেয়া শেষ।

মার্কেটের বাইরে এসে এবার স্ট্রিট ফুড ট্রাই করার পালা। প্রথমেই পাস্তা ট্রাই করলাম, স্পাইসি পাস্তা উইথ মাশরুম। তারপর খেলাম কুলফি মালাই উইথ নুডুলস, তারপর পানিপুরি। মজার বেপার হচ্ছে প্রতিটা ছোট বড় দোকান হতে শুরু করে বেশির ভাগ হকার পর্যন্ত পেটিএম (Paytm) এ বিল নেয়।

খাওয়া শেষ করে আরেকটু ঘুরলাম আশেপাশে, তারপর উবার নিয়ে চলে গেলাম Quest Mall এ, এটি কলকাতার পপুলার শপিং মল গুলার মধ্যে একটা। মোটামুটি সব ব্র্যান্ডেড দোকান ওখানে পাবেন। আমি যদিও শপিং এর ক্ষেত্রে ওরকম ব্র্যান্ড লাভার না, তাই আমার কাছে খুব এট্রাকটিভ কিছু মনে হয়নি, এছাড়াও শপিং করবোনা, এরকমটাই মাইন্ড সেট ছিল।

মার্কেটের ভিতরে কিছুক্ষন ঘোড়াঘুড়ি করে ফুড কোর্টে গিয়ে বসলাম, এবং আমার যে পাওনা ট্রিট ছিল সেটা অবশেষে সেলিব্রেট করা গেল। বিদেশের মাটিতে দেশের কারো সাথে আড্ডা দেবার মজা আলাদা, তাই খুব ভাল সময় কাটলো।

তারপর উবারে করে রওনা দিলাম হোটেলে, আজ রাতের মত জার্নি শেষ। ঘুম দিয়ে কাল সকাল সকাল বের হব।

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই ফ্রেস হয়ে চলে গেলাম হোটেলের রেস্টুরেন্টে। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। বাজেট হোটেল, তাই ব্রেকফাস্টও বাজেট স্টাইলের, তবে স্বাদ ভালই ছিল। খেলাম খিচুরি, এক ধরনের টিক্কা কাবাব, পাউরুটি টোস্ট, ডিম এবং কফি।

এবার প্রথম কাজ হচ্ছে মোবাইল রিচার্জ করার দোকান খুজে বের করা, কেননা মোবাইল ডাটা শেষ। এবং ডাটা নাই মানে উবার হতে শুরু করে অনেক কিছুই বন্ধ। তাই আপাতত মানুষজন কে জিজ্ঞাস করে করে একটি দোকান বের করা গেল, প্রায় ১০ মিনিটের মত হাটতে হয়েছে। ৪৮ রুপি দিইয়ে ৩ জিবি ডাটা নিয়ে নিলাম। পার্ক স্ট্রিট থেকে ভিক্টোরিয়া মেমরিয়াল হাটার দূরত্বে। ম্যাপ দেখে হাটা শুরু করলাম, প্রায় ২০ মিনিটের মত লাগলো খুজে পেতে। টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম, ২০ রুপি ছিল সম্ভবত টিকেট। ঢুকে কিছু ছবি তুললাম, সামনে গিয়ে একটি লেক দেখতে পেলাম, সেখান থেকে আসলে বেশি ভাল লাগছিল, পুরাই রাজকীয় বেপার সেপার। পুরা লেক ঘুড়ে মুল ফটকের সামনে আসলাম, কিছু ছবি তুললাম।

আকাশ মেঘলা হতে শুরু করলো। এখানে বৃষ্টি হলে দাড়ানোর কোন যায়গা নেই, একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে ভবনের ভেতরের জাদুঘর। সামনে যেতেই জানতে পারলাম, আমি শুধু মাত্র এন্ট্রি টিকেট কেটেছি, জাদুঘড়ের টিকেট আলাদা, এবং এটা কাটতে হবে মুল ফটকের সামনের কাউন্টার থেকেই। ইতিমধ্যেই গুড়া গুড়া বৃষ্টি পড়ছে। তাই দ্রুত হেটে টিকেট কাটতে যেই না টিকেট কাউন্টেরর সামনে পৌছালাম, অমনিতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি শুরু, টিকেট কাটলেও জাদুঘড়ে যেতে যেতে পুরো গোসল হয়ে যাবে, তাই আর ও বোকামি করলাম না, বের হয়ে গেলাম। বাইরে কিছু ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল, একটাতে উঠে পড়লাম। অনেক খানি ভিজে গেছি, এখন ভাবার পালা কী করবো?

হোটেলের উদ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম, কিন্তু পরক্ষনেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রওনা দিলাম কলেজরোডের সেই বিক্ষ্যাত কফি হাইজে। যেখানে মান্না দের নিখিলেস, মইদুল, ডি সুজা, রমা রয়, অমল, সুজাতা দের যাতায়েত ছিল। বাইরে বৃষ্টি, আমি ভিতরে ভিজে বসে আছি, যাচ্ছি বিক্ষাত কফি হাউজে, ভালই লাগছে। কলেজ রোডের আশে পাশের এলাকা গুলো দেখে আমাদের পুরান ঢাকার কথা মনে পড়ছে, মনে হচ্ছে বাংলা বাজার আছি।

কিছুক্ষনের মধ্যেই ট্যাক্সি কফি হাউজের সামনে চলে আসলাম, সিড়ি দিয়ে দোতালায় উঠলাম, উঠেই কেমন যেন একটা অনুভুতি কাজ করছে, মনে হচ্ছে কত চেনা জায়গা, কতই না এসেছিলাম এর আগে।

যাই হোক, বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পর রিয়েলাইজ হল, আলাদা করে একটা টেবিল পাওয়া দিবা স্বপ্ন দেখার মত, এর চাইতে ভাল অন্য কারো সাথে টেবিল শেয়ার করা। একটা টেবিল পেলাম, যেখানে দুইজন বসে আছে, আমিও তাদের সাথে বসে গেলাম, সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। যেহেতু এক টেবিলে বসলাম, তাই একটু গল্প জুড়ে দিলাম। তারাও অনেক দূর থেকে এসেছে অনেক দিন পর। ছাত্র জীবনে তারা নিয়মিত এখানে আড্ডা দিত, কিন্তু এখন আর আগের মত আসা হয় না। বসে আছি অনেকক্ষন, কিন্তু কেউ অর্ডার নিতে আসে না, প্রতিটা রো এর জন্য আলাদা লোক নিয়োগ করা আছে, সে ছাড়া অন্য কেউ অর্ডার নিবে না, এবং খাবার পর যেহেতু খুব বেশি বসার সুযোগ নেই, তাই খাবারের অর্ডার নিতেই দেরি করে আসে। এখানে যারাই আসে, তাদের বেশির ভাগ আসে লম্বা সময় বসে থাকার জন্য। কিন্তু আমার হাতেতো সময় কম, এদিক সেদিক তাকিয়েও ওয়েইটারেরে দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। যাই হোক প্রায় ৩০ মিনিট বসে থাকার পর পাওয়া গেল, নুডুলস অর্ডার করলাম, সাথে কফি। কফি হাউজের কফি খেয়ে দেখা উচিত কেমন লাগে। অর্ডার দেবার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খাবার চলে এসেছে। আমি সহ বাকি দুইজন খেতে খেত গল্প করছি। নুডুলসটা অনেক মজা ছিল, কিন্তু কফিটা খুব ভাল লাগেনি। খাবার পর উনি ভুল করে তিনজনের বিল একসাথে করে এনেছেন, এবং কলকাতার যিনি ছিলেন, উনি কোন ভাবেই আমাকে বিল দিতে দিবেন না। উনার একই যুক্তি, আমি গেস্ট। যাই হোক অনেক চেষ্টা করেও আমি ব্যার্থ হলাম। তারপর সেখান থেকে বের হলাম, উদ্যেশ্য, মেট্রোতে করে নিউ মার্কেট এড়িয়াতে যাব, সেই এলাকার নাম হচ্ছে এসপ্লানেড। বের হলাম, হাটা দিলাম, নেয়ারেস্ট মেট্রো স্টেশন প্রায় ১৫ মিনিটের হাটা দুরুতব। হাটছি, বৃষ্টির কারনে ভেজা রাস্তা, হাটতে হাটতে কিছু ছবিও তুললাম, স্ট্রিট ফুড খেলাম।

চলবে…