fbpx

বেঙ্গালুরু ডায়েরি – পর্ব ৪ (শেষ পর্ব)

আমার এবারের মত বেঙ্গালুরু ট্রিপ প্রায় শেষ। আজ সারাদিন ছিলাম কমার্শিয়াল স্ট্রিট এবং বোটানিকাল গার্ডেনে। হোটেলে ব্যাক করলাম যখন তখন সুর্য মামা বিদায় জানাচ্ছে, হোটেলের বাইরে ধোয়া দেয়া হচ্ছে মশার জন্য। হোটেলে গিয়েই রুম সার্ভিসে ফোন দিয়ে ডোসা অর্ডার করলাম, খুব ভাড়ি কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। ডোসা অর্ডার দিয়ে লাগেজ গোছানো শুরু করলাম, এই কাজটা আমি ভাল পারিনা। ট্রিপে যাবার সময়তো মা এবং বউ মিলে লাগেজ গুছিয়ে দেয়, কিন্তু ফেরত আসার সময় হিন্দি ছবির একটি ডায়লগ মনে হয় “আব তেরা কেয়া হোগা কালিয়া”।

আগের পর্ব গুলো পড়ে না থাকলে এখান থেকে পড়ে নিতে পারেন।

যাই হোক, যখন কোন বিকল্প নেই তখন আর কী করার, চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, নেভার গিভ আপ। কেনাকাটা হয়েছে বেশ কিছু, তারচাইতেও বড় সমস্যা হয়েছে পুতুল সহ কিছু খেলনা কেনার কারনে, কারন সাইজ গুলো ফ্রেন্ডলি না। চিন্তা করলাম, খেলনা গুলা লাগেজে ভড়ে, জামা কাপড় যতটুকু সম্ভব ব্যাকপেকে ভড়ে নেই। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করার পর একাধিক বারের চেষ্টায় এবং গানিতিক ক্যালকুলেশনে আমি অবশেষে সব কিছু ঠিক ঠাক ভাবে গুছিয়ে লাগেজ লাগাতে পেরেছি।

এবার ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে যাবার পালা, তাই করলাম। এর মধ্যে রুম সার্ভিস খাবার দিয়ে গেল। আমিও খেয়ে নিলাম। বাসায় ফোন দিলাম, দেখতে দেখতে ১০ টা বেজে গেল। আমি এবার নিচে গেলাম, আফগান গ্রীল। সুইমিং পুলের সাথে তাদের রেস্টুরেন্ট। আমি একদিনও চেষ্টা করিনি, ভাবলাম আজ করি। তাদের একটা থালি অরডার করলাম, সব গুলো আইটেমের কথা মনে নেই, তবে তাদের কাবাব গুলো আসলেই খুব মজার ছিল। এবং আমার মনে হয়েছিল, আরো ১/২ বার ট্রাই করা গেলে মন্দ হত না। আমার আগেই ট্রাই করা উচিৎ ছিল।

থালিতে মজা হচ্ছে একটার পর একটা আইটেম আসে, কোয়ান্টিটি কম থাকে, কিন্তু একাধিক আইটেম ট্রাই করা যায়। কয়েকরকমের কাবাব ছিল, নান, পাকোরা, ঝাল ফ্রাই, এবং পরিশেষে ফির্নি। ধীরে ধীরে খাচ্ছি, কিছুটা বিরহ নিয়ে, চলে যেতে হবে, তাই ভরাক্রান্ত মন নিয়ে চলে যাবার আগের মুহুর্তের হোটেলের বিউটিফিকেশন উপভোগ করার চেষ্টা করলাম।

খাবার শেষ, ঘড়িও জানিয়ে দিচ্ছে, আর দেরি করা যাবে না চান্দু, তাই রুমে গেলাম এবং শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি এবং বিশ্রাম। ১১ঃ৩০ পর্যন্ত একটু টিভি দেখলাম, ক্রস চেক করলাম কিছু রেখে যাচ্ছি নাকি। তারপর ১১ঃ৩০ এ বের হয়ে চেক আউট হবার ফর্মালিটি সম্পন্ন করছি।

ফর্মালিটি সম্পন্ন করতে করতে ১২ টার মত বেজে গিয়েছে, আমাকে নেয়ার জন্য ড্রাইভার চলে এসেছে, আমি সব সম্পন্ন করে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি চলছে এয়ারপোর্টের দিকে। রাতের শহড় সবসময় একটা অন্য রকম সৌন্দর্যে সেজে থাকে, বেঙ্গালুরুতেও তেমনটাই লাগলো। রাতের এয়ারপোর্ট টার্মিনাল মুলত দূর থেকে অনেক সুন্দর লাগে, নিজের অজান্তেই এক ধরনের ফিলিং ক্রিয়েট করে ফেলে, আমার ক্ষেত্রেও এমন হয়, বাকিদের কেমন হয় জানিনা। দেখতে দেখতে চলে আসলাম, ড্রাইভার ভাইকে বিদায় দিয়ে টার্মিনালের ভিতরে ঢুকে শ্রীলংকান এয়ারওয়েইসের কাউন্টার খুজতে লাগলাম। বেশ কিছুটা সামনে আগানোর পর পেয়ে গেলাম।

যেহেতু বিজনেস ক্লাস, তারমানে কিছু আলাদা প্রায়রিটি ছিল, যেহেতু আমার দুইবার ফ্লাই করতে হবে, তাই দুইটা বোর্ডিং পাশ আমাকে এখান থেকেই দেয়া হল, সাথে দুইটা ভিআইপি লাইঞ্জের একসেস পাশ। একটি বেঙ্গালুরু, আরেকটি শ্রীলংকা, প্রায় ৪ ঘন্টার ট্রানসিট।

ইমিগ্রেশন এবং ফাইনাল চেকিং শেষ করে ভিআইপি লাইঞ্জে বসে ইন্টারনেট ব্রাউস করছি, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, কেননা এমনিতেই ভরপেট খেয়ে এসেছি, কফি খাব কী খাবনা তা নিয়ে কিছুটা দিধা দন্দে আছি। দেখতে দেখতে বোর্ডিং এর টাইম চলে আসলো। আমিও হাটি হাটি পা পা করে গিয়ে বসে পরলাম। এমনিতেই বিমানে বসে সবাই কম বেশী সেলফি তোলে, আমিও ভাবলাম একটা তুলে রাখা উচিৎ, যাতে স্মৃতির সাথে সাথে ব্লগেও রেখে দেয়া যায়। এয়ারহোস্ট্রেস, গরম পানি দিয়ে ভেজানো ছোট তোয়ালে দিল মুখ মুছার জন্য, ফ্রেশ লাগবে। আসলেই ফ্রেশ লেগেছিল। তারপর খাবারের মেনু, আমি দেখলাম পিজা আছে, কেমন হবে জানিনা, প্রশ্ন করলাম এটা কিভাবে দিবেন, স্লাইস হিসেবে? উনি বললো হ্যা, ঠিক স্লাইস না, গোল হবে, কিন্তু ছোট, আমি বললাম তাহলে ঠিক আছে।

পিজা অর্ডার করলাম, বিমানে বসে কাস্টম অর্ডার, মজার বেপার টা। যাই হোক, দেড় ঘণ্টা লাগবে শ্রীলংকা পৌছাতে, আমিও কিছুটা রেস্ট নেয়ার চেষ্টা করছি। বিজনেস ক্লাসে সব মিলিয়ে আমরা সম্ভবত ৪ জন ছিলাম, বেশির ভাগ সিট ফাকা ছিল। যাত্রি হিসেবে আসন ফাকা থাকলে ভাল লাগে, কিন্তু ব্যাবসায়ি হিসেবে চিন্তা করলে মন খারাপ হয় 🙁

যাই হোক দেখতে দেখতে চলে আসলাম শ্রীলংকা। শ্রীলংকান এয়ারপোর্টের নামে হচ্ছে Bandaranaike International Airport, অনেকটা আমাদের মতই, তবে সম্ভবত আমাদেরটার চাইতে বড় এবং কিছুটা ডেভেলপড। বিমান থেকে নেমে একটু এদিক সেদিক ঘুড়লাম, এয়ারপোর্ট টা দেখার চেষ্টা করলাম, তারপর আমার ফ্রী একসেস ওয়ালা ভিআইপি লাউঞ্জ খুজে ওখানে গিয়ে বসলাম। এখানেও কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না, তাই বসে বসে ভাবছি কী করবো? ভোর হওয়া দেখবো, নাকি একটু ঘুম দিব? পরে ডিসাইড করলাম ভোর হওয়া দেখবো। ভোর হওয়া দেখতে দেখতে কিছু ছবি তুলেছি, আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

দুবাই দেখা হয়নি তাতে কী? দুবাই এয়ারওয়েজের বিমানতো দেখা হয়েছে!

দেখতে দেখতে আবার বোর্ডিং এর টাইম চলে আসলো, এবার ফ্লাইট হচ্ছে কলম্বো টু ঢাকা, তারমানে বিমানের বেশির ভাগ যাত্রি হবে বাংলাদেশি, এটাও একটা মজার বেপার। বোর্ডিং গেইটের দিকে যেতেই দেখা হল অনেক অনেক বাংলাদেশি ভাইদের সাথে, অনেকেই আছেন চেন্নাই থেকে, তারা সম্ভবত চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন, অনেকেই মিডল ইস্ট থেকে, প্রবাসি। যাদের কষ্টের আয়ে আমাদের দেশের চাকা ঘুড়ছে। ওনাদের দেখলে ভালই লাগে, আবার এটাও মনে হয়, এই মেহনতি মানূষগুলোর স্কীল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে যদি কাজ করা যেত, তাহলে এরা আরো অনেক বেশি ভাল করতে পারতো, তারা পরিশ্রমি, তাদেরকে আরো উন্নত কারিগরি স্কীল দেয়া গেলে আমরা আরো অনেক দ্রুত এগোতে পারতাম।

অপেক্ষা করছি, এবার বিমানে উঠার পালা, যেহেতু বিজনেস ক্লাস আগে প্রায়রিটি পায় অনবোর্ড এর জন্য, তাই সে সুবাদে আগে অনবোর্ড হওয়া গেল। এবার আসলেই মনে হচ্ছে কখন বাড়ি ফিরবো। দেখতে দেখতে ফ্লাইট টাইম হয়ে গেল। আমরা ধিরে ধিরে মুল রানওয়েতে যাচ্ছি, বিমান দ্রুত চলা শুরু করলো, আরো দ্রুত, আমরা উড়তে শুরু করলাম। বাইরের ওয়েদার যথেষ্ট রৌদ্র উজ্জ্বল। এই রৌদ্র উজ্জ্বল ওয়েদারে এবার আর পিজা খেতে ইচ্ছে করলো না, মনে হল ডিম খাই। তাই এবার অর্ডার করলাম স্প্যানিশ অমলেট। স্পেন যাওয়া হয়নি তো কি হয়েছে, শ্রীলংকার আকাশে, শ্রীলংকার বিমানে, সম্ভবত শ্রীলংকান মুরগির ডিম দিয়ে স্প্যানিশ অমলেটতো খেয়েছি, এটা ভাবলেই অনেক ভাল লাগবে। তাই এবার স্প্যানিশ অমলেট খাব। সাথে আছে চিকেন সসেজ, শাক এবং কিছু ফলমুল। খেয়ে নিলাম, খাওয়ার পর স্প্যানিশ ফিলিং নিয়ে একটু ঘুম দিব কিনা ভাবছি। পরে মনে হল ভেবে লাভ নেই, একটু ঘুম দেই, আকাশে ঘুমানোর মধ্যে এক ধরনের রাজকীয় ভাব আছে। রাজা নই তাই বলে একটু ভাব নেয়া যাবেনা, এটা কেমন কথা। তারমধ্যে আকাশে আছি, ঠিক ঠাক ভাবে আল্লাহ চাইলে ৩ ঘন্টা পর মাটিতে নামবো। (অহংকার করা যাবে না, অহংকার করলে যে কোন সময় মাটিতে নামা লাগতে পারে)।

দেখতে দেখতে ঢাকাতে চলে আসলাম, খুব ভাল লাগছে, প্রিয় শহর, ঢাকা শহর। চিরকুটের গান মনে পরে গেল, মনে মনে গাইতে ইচ্ছে করছে, এ শহর, যাদুর শহর, প্রানের শহর, ঢাকারে, আহারে।

ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজের জন্য অপেক্ষা। বিজনেস ক্লাস লাগেজ প্রায়রিটি পায়, তাই আমারটা প্রথম দিকেই চলে আসলো। বাইরে বের হয়ে উবার কল করলাম, উবার চলে আসলো, আমিও জ্যাম ঠেলে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এবং ভাবছি, আল্লাহ পৃথিবীকে কত বৈচিত্রময় করে তৈরি করেছে, প্রকৃতি হতে শুরু করে মানুষ, তাদের চিন্তা ভাবনা, তাদের লাইফস্টাইল, তাদের খাবার, সবকিছুতেই কত পরিবর্তন। কত কিছুই না বাকি আছে দেখার, আল্লাহ বাচিয়ে রাখলে হয়ত সামনে আবার অন্য কোন শহর হয়ত দেখা হবে, আর দেখা হলে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। আপাতত এটুকুই, সামনে লিখবো, সেবু (ফিলিপাইন), সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, হংকং এবং মালায়শিয়া নিয়ে 🙂

নোটঃ সাইক্লোন “ফনি” এর জন্য আসলে আমার আগের কেটে রাখা ফ্লাইট পরিবর্তন করতে হয়েছে, এবং টিকেট না পাবার কারনে বাধ্য হয়ে বিজনেস ক্লাস কাটতে হয়েছিল, আমি আসলে ইকনমি ক্লাসের যাত্রি, পরবর্তি ফ্লাইটেই আবার ইকনমি ক্লাসে ফেরত আসবো।

সবাই ভাল থাকবেন, যদিও আমার এই পোস্ট গুলো ভ্রমন সম্পর্কিত, কিন্তু আমি মুলত ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে লিখা লিখি করি, এছাড়াও আমার ফেসবুক গ্রুপে নিয়মিত ডিজিটাল মার্কেটিং রিলেটেড নলেজ শেয়ার করে থাকি, গ্রুপে জয়েন করতে এখানে ক্লিক করুন