বেঙ্গালুরু ডায়েরি – পর্ব ২

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই রেডি হয়ে গেলাম, আজ বেশ কিছু গুরুত্ব পুর্ন মিটিং আছে এর মধ্যে বেশ কিছু সেশন রয়েছে যা পুরো মনযোগ দিয়ে শুনতে হবে। রেডি হয়েই ব্যাগ গুছিয়ে নিচে চলে গেলাম সকালের নাস্তা করতে। কমপ্লিমেন্টারি। যেতে হবে রাজ প্যাভিলিয়নে। এটাও এই হোটেলের একটি রেস্টুরেন্ট। মুলত সকালের বুফে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট এর আয়োজন এখানেই করা হয়। যেহেতু আগেই বলেছি, তাদের সব কিছুর সাথেই রাজ প্রাসাদ টাইপ একটা ভাব আছে, রেস্টুরেন্টের নাম গুলাও একই রকম। ওহ আরো একটা জিনিশ বলা হয়নি, আপনি খেতে খেতেই অথবা অর্ডার দেয়ার পর চাইলেই তাদের মুল বাবুর্চির সাথে কথা বলতে পারবেন। উনি নিজে থেকেও এসে ফীডব্যাক জানতে চান। এটা নির্সন্দেহে একটি চমৎকার এপ্রোচ। যেকোন ব্যাবসার সফলতা নির্ভর করে আপনি আপনার এক্সিস্টিং কাস্টমারদেরকে কতটা সন্তুষ্ট করতে পারছেন। কেননা আপনার প্রতিটা হ্যাপি কাস্টমার আপনার এম্বাসেডরের রোল প্লে করবে।

প্রথম দিনের নাস্তা, তাই একটু কৌতুহল বেশি ছিল, তাদের পরিবেশন, মেনু, বিশেষ করে ট্রেডিশনাল কী কী আছে। শুরুতেই একজন ছিলেন যিনি নানান রকমের ডিম ভেজে থাকেন, তাদের একটি ট্রেডিশনাল ডিমের মেনু হচ্ছে মাসালা অমলেট। আমাদের মতই, তবে পার্থক্য হচ্ছে আমরা যেমন শুধুমাত্র, পিয়াজ, কাচামরিচে সিমাবদ্ধ থাকি, ওরা আরো মশলা দেয়। আমার কাছে সাধ ভাল লেগেছে অনেক। আরো একটি মজার ডিশ হচ্ছে “এগ ভুর্জি” এই ডিমের ডিশটা অসাধারন। ডিম ফেটে এক ধরনের স্পাইসি মশলা দিয়ে ভাজির মত করে ফেলে, তখন ডিমটাকেই মেইন ডিশ মনে হয়, সাথে টমেটো/চিলি ক্যাচাপ দিয়ে খেতে হয়। একটু ঝাল ঝাল, সাউথ ইন্ডীয়ার খাবারের মধ্যে মশলার আধিপত্য থাকেই।

এছাড়াও আর যা যা ছিল, চিকেন সসেজ, বেশ কিছু ধরনের ডাল এবং সবজি, এক ধরনের ভাত, নুডুলস, ২ রকমের ইডলি, প্যান কেক এবং মধু, স্পানিশ পাউরুটি টোস্ট। এছাড়াও বললে ওরা যেকোন রকমের ডোসা করে দিবে সাথে সাম্বার এবং চাটনি থাকবে। আমিও ট্রাই করেছি, মাসালা ডোসা এবং এগ ডোসা। ওদের আরো একধরনের স্পেশাল ডোসা আছে, এটাকে বলে রাগি ডোসা একদিন খেয়েছিলাম, ভালই লেগেছে। আগে খাবারের অনেক ছবি তুলতাম, এখন তোলা হয়না খুব একটা, তবে লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে তুলে রাখলে হয়ত ভাল হত, কিছু তোলা আছে, সেগুলো শেয়ার করছি।

এছাড়াও, কিছু বেকারি আইটেম, বাদাম, ফ্রুটস ছিল। ছিল ফালুদা, টক দই, স্ট্রবেরি দই, ব্যানানা দই। টেস্ট খারাপ না।

একট জুস কর্নার ছিল, যেখানে বললে ওরা ইন্সটেন্ট জুস তৈরি করে দেয়, লাচ্ছিও আছে। আমি লাচ্ছি ট্রাই করেছিলাম, ওরা এটাকে লাসসি উচ্চারন করে থাকে, এটার সাধ কে আমার কাছে কিছুটা ডিফরেন্ট মনে হয়েছে বাংলাদেশ থেকে এবং সাধ ওদেরটাই বেশি ভাল লেগেছে।

বর্ননাতে অনেক খাবার লিখলেও সব আমার টেস্ট করা হয়নি, কিছুটা ঝটপট করেই শেষ করতে হয়েছে, তারপর উবারে কল দিলাম। এখানে উবারে কল দেয়ার পর মুলত ফোন দেয়া লাগে না, ওরা ম্যাপ দেখে পিক আপ লোকেশনে চলে আসে। উবার গো ট্রাই করলাম আমাদের দেশে যেটা উবার এক্স। গাড়ির কন্ডিশন ভালই, ওদের একটা মজার বেপার হচ্ছে আপনি না বললে ওরা জানালা খুলে রাখে, এসি ছাড়ে না। তাই প্রতিবার আমার উঠে বলতে হয়েছে এসি ছাড়ার জন্য।

সকাল বেলা, কর্ম ব্যাস্ত দিনের শুরু, সবাই অফিসের গন্তব্যে, সোমবার সকাল সবসময় স্পেশাল, যেমনটা আমাদের ক্ষেত্রে হয়, শনি অথবা রবিবারে। প্রায় ২০ মিনিটের মত লাগলো WeWork এ পৌছাতে, ওখানে গিয়ে কিছু ফরমালিটি সম্পন্ন করতে হল, তারপর আমি আমার চাবি বুঝে পেলাম। একটি ১৩ তলা বিল্ডীং, পুরাটাই ওদের, অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের অফিস আছে ওখানে।

বেঙ্গালুরুতে সম্ভবত ৪ টি WeWork এর অফিস আছে, এর মধ্যে আমি যেটাতে আছি এটা অনেক বড়, ওদের ইন্টেরিয়রের কিছু ছবি আমি এই পোস্টে শেয়ার করবো। ওদের বেশ কিছু জিনিশ আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ফ্লেভারড ওয়াটার। ওরা যেটা করে, একটি বড় জারের মধ্যে তরমুজ এবং আনারস কেটে জারের দেয়াল জুড়ে রেখে দেয়, সাথে থাকে বরফ। আপনি যখন সেই জার থেকে পানি নিয়ে খাবেন, তখন আসলে আপনি সেই পানির মধ্যে সেই ফলের ফ্লেভারটা পাবেন, তারমানে এটা জুসের মত কিছুও না, আবার একদম প্লেইন পানিও না, আবার যতটুকু ফ্লেভার পেলেন, তাও নেচারাল। বেপারটা আমার কাছে খুব ক্রিয়েটিভ মনে হয়েছে।

WeWork 1WeWork 2WeWork 3

আনলিমিটেড কফি এবং নির্দিষ্ট কিছু কুকিস আছে, ড্রিংকিং ওয়াটার, এবং নানা রকমের চা। ছোট ছোট মিটিং রুম আছে, সাথে বড় সাইজের টিভি, সো বিভিন্ন সাইজের মিটিং সহজেই করে ফেলা যায়। ভিতর দিয়েই একটি সিড়ি আছে, যা দিয়ে এক তলা থেকে আরেক তলাতে যাওয়া যাবে। আমি ছিলাম ১০ তলাতে, এখানে আবার একটা বারান্দা আছে, যেটা নন এসি, মানে অনেকটা খোলা আকাশের নিচে, এখান থেকে বেঙ্গালুরুর ভিউটাও আমার কাছে অসাধারন লেগেছে, এই ভিউটা শুধু এই ফ্লোর থেকেই পাওয়া যায়।

WeWork 4

সারাদিন কাজ এবং মিটিং শেষ করে হোটেলে ফেরত আসলাম। তারপর একটা ঘুম দিলাম।

আজ একটু রিল্যাক্স মুডে আছি, একটু কোথায় ঘুড়তে বের হব। তবে তেমন দূরে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত হোটেলেই অলস সময় কাটালাম। ফেনিক্স মার্কেটসিটি নামে একটি মার্কেট এড়িয়া আছে, সব বড় বড় ব্র্যান্ড গুলো ওখানে আছে। ভাবলাম তাহলে একটু ওখান থেকেই ঘুড়ে আসা যাক।

উবার কল করলাম। প্রায় ৪০০ রুপির মত ভাড়া পরবে, তারমানে খুব কাছেও না। উবারে করে যাওয়ার পথে হঠাৎ করে মনে হল ফেসবুক লাইভে গিয়ে আপনাদেরকে শহড়টা দেখাই, যেমন ভাবা তেমন কাজ। প্রায় ২৮ মিনিটের একটা লাইভ সেশন ছিল। ঝামেলাটা বাজলো, লাইভ শেষ করার পর আমি ভুলে সেইভ ভিডীও অপশন ক্লিক করলাম। তারমানে ভিডিও ডাউনলোড হওয়া শুরু করলো, মোবাইল ডাটা। বেশি ঝামেলাটা বাজলো যখন দেখলাম মোবাইলের চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার সাথে ছিলনা পাওয়ার ব্যাঙ্ক এবং চার্জিং ক্যাবল।

মার্কেটে ঢুকতেই চোখে পড়লো বার্গার কিং, লাঞ্চ করা হয়নি, তাই ভাবলাম একটু খেয়ে নেই। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ছুটির দিন হওয়াতে বিশাল লাইন, লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিয়ে ভাগ্য ক্রমে একটি টেবিল খালি পেয়ে বসে পড়লাম। খেতে খেতে বাংলাদেশে এক বন্ধুর সাথে ফোনে একটু কথা বললাম। সব পরিস্থিতিতেই বন্ধুদের সাথে কথা বলার এক অন্য রকম তৃপ্তি আছে।

Phoenix market city 1 Phoenix market city 2 Phoenix market city 3 Phoenix market city 4

খাবার শেষ করে সবার প্রথমেই খুজতে লাগলাম খেলনার দোকান, পাওয়া গেল ToysRush, অন্যান্য দেশের মতই, বিশাল শোরুম তাদের। দামও একটু বেশী, সুবিধা একটাই যেহেতু অনেক বড় দোকান, তারমানে কালেকশন অনেক, সময় কম থাকলে বেস্ট সলিউশন।

যেটা পছন্দ হয়, দাম বাজেটের চাইতে বেশি, যেটা বাজেটের মধ্যে সেটা পছন্দ হয়না, সব শেষে অনেকক্ষন ঘুড়তে ঘুড়তে ছেলের জন্য একটি ব্যাগ, বিমান এবং কিছু পেন্সিল কিনলাম, মেয়ের জন্য দুইটা পুতুলন সহ টুকটাক আরো কিছু। মজার বেপার হচ্ছে এর মধ্যে একটা পুতুল আমি নিজের হাতে তৈরি করেছি, আবার সেই পুতুলের বার্থ সার্টিফিকেটও দিয়েছে প্রিন্ট করে। বেপারটা ইন্টারেস্টিং, এবং এই মার্কেটিং এপ্রোচটা ভাল লেগেছে, অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নতুন কিছু যোগ হল।

তারপর বের হয়ে বাচ্চাদের কিছু জামা কাপড়ের দোকানে গেলাম, বাবা দের সমস্যাই এটা, সব কিছুতেই বাচ্চা কাচ্চা প্রায়রিটি পায়, তারপর বাকিরা। নিজের প্রায়রিটি সবার শেষে তারপরেই গেলাম বই এর দোকানে, বই কিনলাম ৭ টা, এখন পড়ছি, পড়ার পরে সেগুলার রিভিউ দিব, এর মধ্যে বেশ কিছু বই আমি অডিও বুক হিসেবে আগেই শুনেছি, এখন পড়ছি। কিছু ভাল বই বার বার পড়া যায়, তাহলে ভাল রেজাল্ট পাওয়া যায়।

বই কেনার পর যেটা হল, সেটা হচ্ছে ব্যাগ গুলো ভাড়ি হয়ে গিয়েছে। হাতে বেশ কিছু ব্যাগ জমে গেছে, এবং বই এর কারনে ভাড় বেরে যাওয়াতে হাটতেও কিঞ্চিত কষ্ট হচ্ছে, যাই হোক হাটতে হাটতে টপ ফ্লোরে গেলাম। গিয়ে মনে হল ছোলা ভাটোরা খাই, এখানেও বিশাল ভিড়। অনেক কষ্টে একটি টেবিল ফাকা পেলাম, তাও শেয়ারে বসতে হয়েছে, অপর পাশে এক ভদ্র মহিলা এবং তার মেয়ে। মুলত অনেক সময় চেহারা দেখে অনেক কিছু বোঝা যায়, কিন্তু তাদের চেহারা দেখে আমি কিছুটা কনফিউজড। কেননা আমার কাছে বেশ কিছু শপিং ব্যাগ ছিল যা টেবিলের যায়গা দখল করছিল। ভদ্র মহিলার চেহারা দেখে একবার মনে হল উনি বিরক্ত। কিন্তু আমি কনফিউজড বিরক্ত কি আমার শপিং ব্যাগের জন্য, নাকি উনার খাবার পছন্দ হয়নি। কার্নাটা ভাষায় কথা বলায় বুঝারো উপায় নেই, হিন্দি বললে বুঝতে পারতাম।

ছোলা ভাটোরা খাওয়া শেষ করে বিগ বাজারে গেলাম, বিগ বাজার আসলেই অনেক বিগ। জামা কাপড় হতে শুরু করে গ্রোসারিস সব আছে। এক মাথা থেকে আরেক মাথা যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয়। সিঙ্গাপুরে ফেয়ার প্রাইসের আউটলেট গুলো অনেক বড় হয়, কিন্তু বিগ বাজারের এই আউটলেট আমার তার থেকেও অনেক বড় মনে হল।

CholaBatora

সব কেনাকাটা যখন শেষ, বের হব, বের হয়ে আবিস্কার হল আমার মোবাইলের চার্জ আছে ২%। রাত বাজে ১০ঃ৩০। উবার কানেক্ট করার চেষ্টা করতে করতেই মোবাইল বন্ধ পুরাই একটা ভেবাচেকা অবস্থা, কেননা, হাতে একটাই অপশন সেটা হচ্ছে অটো (আমাদের সিএনজি)। সমস্যা ওখানে না, সমস্যা হচ্ছে আমার হোটেলের নাম মনে থাকলেও মনে নেই এলাকার নাম, আর এই হোটেল শহড় থেকে একটু বাইরে হওয়াতে অটো ওয়ালারা তেমন একটা চিনে না। যাই হোক অটো দামাদামি করছি, অবশেষে ৫৩০ রুপিতে একজন রাজি হলেন। রওনা দিলাম, কিছুদুর যাওয়ার পর দেখা গেল উনিও চিনে না, এবং উনার সাথেও উনার মোবাইল নেই। আমার কাছে আছে রুমের ডিজিটাল চাবি, যেখানে হোটেলের নাম থাকলেও নেই ঠিকানা। এ এক মিশ্র অভিজ্ঞতা, অনেক রাত, টেকনোলজি ডেপেন্ডেট মানুষ টেকনোলজি ব্যাবহার করতে পারছে না, অচেনা শহড়। মনে থাকার মধ্যে যেটা মনে আছে, এটা শহড় থেকে একটু বাইরে, এয়ারপোর্ট রোডের সাথে কানেক্টেড। সম্ভবত এলাকার নাম গলফ ক্লাব রোড টাইপের কিছু একটা, আর হোটেলে ঢুকার জন্য হোটেলের নিজস্ব সেতু আছে, এবং যেই মোড় থেকে হোটেলে ঢোকার আলাদা রাস্তা শুরু হয়, সেটা মনে আছে। আপাতত ওটার উপর ভরসা করেই আমি এবং আমার অটো ওয়ালা চলছি, মাঝে মাঝে কোন পথচারি অথবা অন্য গাড়ির চালকের কাছ থেকে ইনফরমেশন নিয়ে আগে বাড়ছে আমাদের অটো। মোড় গুলো আসলে আমি চোখ বড় বড় করে বুঝার চেষ্টা করছি এটাকি সেই মোড় কিনা। সে এক মজার অভিজ্ঞতা, সিনেমার মত যদি বেক গ্রাউন্ড কিছু মিউসিক বাজতো তাহলে ভাল হত। যেহেতু মোবাইলে চার্জ নেই, তাই সেই মুহুর্ত ভিডীও করে রেখে আপনাদের সাথে শেয়ার করার সুযোগো নেই। এরকম বেশ কিছু মোড় চলে গেল, এবং অবশেষে আমি দেখা পেলাম সেই পরিচিত মোড়, যেখান থেকে হোটেলে ঢুকার আলাদা রাস্তা শুরু হয়। সে এক স্বস্তির নিশ্বাস।

হোটেলের সিমানায় ঢুকার চেক পোস্টেই অটো থামিয়ে দেয়া হল, কারন এই হোটেলে অটো ঢোকা এলাও না। কি আর করার, বিরক্ত হলেও নেমে গেলাম, আমার বিরক্ত দেখেই হয়ত উনারা আমার হাত থেকে শপিংব্যাগ গুলো নিয়ে গেল, এবং বললো স্যার, আপনি যান, আমরা ব্যাগগুলো আপনার রুমে পৌছে দিচ্ছি। একদিকে একটু মেজাজ খারাপ, অন্যদিকে কষ্ট করে হলেও হোটেলে নিরাপদে পৌছাতে পেরেছি, তাই একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়াতে অটো ওয়ালাকে ৫৫০ রুপি দিয়ে একটা হাসি দিয়ে রুমের দিকে রওনা দিলাম।

আজকের গন্তব্য কমার্শিয়াল স্ট্রিট। আমি শুধু জানি এটা এমন একটি যায়গা যেখানে অনেক স্ট্রিট শপিং এর ব্যাবস্থা আছে। উবার কল করলাম। রওনা দিলাম। ব্যাঙ্গালোর শহড়ের তাপমাত্রা আমাদের চাইতেও বেশি, তারমানে প্রচন্ড গড়ম। আমার হোটেল থেকে কমার্শিয়াল স্ট্রিটের ভাড়া হচ্ছে ৮৬ রুপি। তারমানে রাস্তা খুব বেশি না। সম্ভবত ১০-১৫ মিনিটের মত লেগেছিল। ড্রাইভার বললো, ভাই চলে এসেছি। রাস্তার ওপার দেখিয়ে দিয়ে বললো, এটাই কমার্শিয়াল স্ট্রিট। ভাড়া দিয়ে নেমে রাস্তা পার হলাম, অনেকেই সিগনাল ছাড়াই পার হল, কিন্তু আমি বাধ্য সচেতন নাগরিকের মত অপেক্ষা করলাম, সিগনাল পরলো, তারপর পার হলাম। ওপারে যাওয়ার পরেই যেটা বুঝলাম সেটা হচ্ছে বিশাল এলাকা, ডানে বামে, বেশির ভাগ বিল্ডিং দুই থেকে তিন তলা। এবং বেশির ভাগ বিল্ডিং এই দুইটা দোকান, একটি নিচ ততালে, অথবা কিছুটা আন্ডার গ্রাউন্ডে, এবং অপরটি দুই তলাতে। কিছু কিছু দোকানকে ব্র্যান্ডেড মনে হল, কিছু মনে হল দড় দাম করে কেনা যায় এমন খুচরা বিক্রি করার দোকান।

আরো একটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলাম একটি বোরকার দোকান, ভেতরে যাওয়ার পর দেখলাম ইরানি বোরকা, এবং অনেক সুন্দর সুন্দর পাঞ্জাবি। নিজেকে সংযত করলাম, এবং বোঝালাম এই মুহুর্তে পাঞ্জাবির কোন দরকার নেই। এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পেরেছিলাম, এবং কিছু না কিনেই সেই দোকান থেকে বের হওয়া গেল। বাইরে বের হতেই দেখলাম আমাদের নিউ মার্কেটের বাইরে যেমন কানের দুলের দোকান আছে এমন কিছু দোকান। একটু সামনে যেতেই দেখলাম আরো চিকন গলি। গলির দুই পাশেই যথারিতি অনেক রকমের দোকান। অনেকটা আমাদের পুরান ঢাকার মত।

আরেকটি মজার বেপার হচ্ছে এখানের প্রায় ৯৫ ভাগ দোকান হচ্ছে মুসলিম দোকান, দোকানদার টুপি মাথায় দিয়ে আছে, কেউ কেউ পাঞ্জাবি/জুব্বা পরা। অনেক অল্প বয়সের ছেলে বাবাকে সাহায্য করছে। এবং ক্রেতাদের একতা বড় অংশও মুসলিম। কিছু দোকান দেখলাম, যেখানে ব্যাগ বিক্রি হচ্ছে, খুবই কম দামে। ইন্ডিয়ান ৩০০ রুপিতে মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে। কোয়ালিটিও খারাপ মনে হল না। থ্রী পিসের দোকান আছে, কিছু ফিক্সড প্রাইস, কিছু কিঞ্চিত দামাদামি করতে হবে। ৩৫০ থেকে ১০০০ রুপি পর্যন্ত চোখে পড়লো।

গলির মধ্যেই এক লোক দেখলাম, গাড়িতে করে কিছু বিক্রি করছে, কিছু ফলমুল, মুড়ি এবং এক ধরনের শড়বত। দেখতে অনেকটা মাঠার মত। মনে হল মুড়ি চেষ্টা করে দেখি। এটি কী, প্রশ্ন করতেই সে বললো ঝাল মুড়ি। বেপারটা মজার লাগলো, ভেবেছিলাম তাদের হয়ত অন্য কোন নাম আছে। আমি বললাম আমাকে এক প্লেট দেন। কিছু মশলা দিয়ে বানিয়ে দিয়েছে, দাম হচ্ছে ৩০ রুপি। যেহেতু আগে দাম করিনি, একটু কনফিউশন লাগছে, আমাকে ভিনদেশি ভেবে ঠকিয়ে দিল কিনা। কোয়ান্টিটি অনেক ছিল, টেস্ট খুব একটা ভাল লাগেনি। আমাদের ঝালমুড়ি বেশি মজা। শড়বত ট্রাই করলাম, ১০ রুপি। মাঠার মতই অনেকটা, তবে টক দই, চিনি না থাকাতে টক ছিল। খারাপ না।

আবার হেটে হেটে দেখতে থাকলাম, প্রায় দুই ঘন্টার উপর ঘুড়লাম, ঘুড়তে ঘুড়তে একটি মসজিদ পেলাম, ঘড়ি দেখে ফিল হল জোহরের নামাজের সময় চলে আসছে, তাই ভাবলাম নামাজটা পরে নেয়া যেতে পারে। মসজিদের নাম জুম্মাহ মসজিদ। অজুখানার পাশেই মসজিদে জুতা রাখার আলাদা একটা ঘড় আছে, যার ফলে জুতা নিয়ে মুল মসিজিদের ভিতরে ঢুকতে হয় না। নামাজ শেষ করলাম, তারপর আবার বের হয়ে হাটা শুরু করলাম। চোখে পড়লো, ভেলপুরির মত কিছু একটা, এটার নাম কাচুরি। ভেলপুরির মতই, একটি পুরি আছে, শুধু ভেতরে ঘুম্নির যায়গাতে দই ফুচকার মত টক দই, চানাচুর সহ কিছু আইটেম। কাচুরি বাংলাদেশেও পাওয়া যায়। সাধ ভাল। পরিবেশনটা আরো ভাল, ফয়েলপেপার দিয়ে ওয়ানটাইম বাটির মত করে বানানো হয়েছে। আমার কাছে আইডিয়াটা ভাল লেগেছে। বাংলাদেশেও চাইলে রাস্তার ফুচকার দোকান গুলোতে ওয়ানটাইম প্লেটের কালচার শুরু হতে পারে, তাহলে একই পানি দিয়ে বার বার ধোয়ার কারনে যারা এই দোকান গুলোকে এড়িয়ে চলে, তাদেরকে এট্রাকট করা যাবে। কাচুরি খাবার পর মনে হল ওনার সাথে একটা ছবি তুলে রাখা যেতে পারে, স্মৃতিতে থেকে গেল।

Bangalore 7

তারপর সামনে ডাব দেখলাম, লোভ সামলাতে পারলাম না। ডাব ছিল ৪০ রুপি, কাচুরি ২০ রুপি।

মজার বেপার হচ্ছে ফুটপাতের একটি দোকান, আপনি স্ক্যান করে Paytm দিয়ে পে করতে পারবেন। আমি ৩ জোড়া মোজা কিনলাম ৮০ রুপি দিয়ে। এইভাবে অনেকটা সময় ঘুড়লাম, খুব বেশী কিছু কিনিনি, কেননা তেমন কিছু কেনার মত প্লান ছিল না, এবং সব আইটেমের কোয়ালিটি ভাল লাগেনি। তবে ফুটপাতের খাবার গুলো খুব মজার ছিল, মনে ধরেছে, একদম শেষ মুহুর্তে লেবুর শড়বত, অসাধারন।

এখানে ঘুড়তে ঘুড়তে দেখলাম অনেকখন হয়ে গিয়েছে, প্রায় তিনটা। অনেক হাবিজাবি খেলেও দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি। এবার হোটেলে ফেরত যাওয়া যায়। উবার কল করলাম, উবারে উঠে হোটেলে যাচ্ছি, হঠাৎ করে মনে হল, নাহ হোটেলে না যাই। আরো কোন একটি যায়গা ঘুড়ে দেখা যাক। যদিও কিছুটা টায়ার্ড, কিন্তু টায়ার্ডনেস আটকাতে পারবে, এমনটা হবার কথানা। যেই ভাবনা সেই কাজ, মনে হল লালবাগ বোটানিকাল গার্ডেনটা ঘুড়ে দেখা যাক। তারচাইতেও বড় কথা, আমাদের লালবাগ আর তাদের লালবাগের পার্থক্যটাও দেখা উচিৎ। উবারে বসেই ডেস্টিনেশন চ্যাঞ্জ করলাম গাড়ি এখন লালবাগ বোটানিকাল গার্ডেনের দিকে যাচ্ছে…

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here